রেলওয়ে স্টেশনটা আজও আগের মতোই আছে- ধূলিধূসর প্ল্যাটফর্ম, যাত্রীছাউনি, বৃষ্টির পানিতে ক্ষয়ে যাওয়া সাইনবোর্ড, নিয়নলাইটের আলো, পুরোনো ছাদ এবং নিচে গুমোট অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষার প্রহর। সময় যেন থেমে গিয়েছে তার নিজ প্রয়োজনেই! শুধু ট্রেনগুলোই নির্ধারিত সময়ে আসা-যাওয়া করে। যাত্রী আসে, যাত্রী যায় কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যায় সময়ের কাছে বন্দী হয়ে। সময় যেন এখানে শেকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাত আনুমানিক দশটা। ইস্টিশনের চারপাশটা কেমন যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার ও নির্জন। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকাদের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। বাতাস ভারী, যেন কোনো অদৃশ্য বেদনার ভার বইছে।মৃদু আলোতে সবকিছু স্পষ্ট দেখা না গেলেও পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থা কিছুটা আঁচ করা যায়। এক কোণে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ। মাথায় তার সাদা টুপি, গায়ে ধূসর- মলিন পাঞ্জাবি, পায়ে রংচটা গোছের চপ্পল। মনে হয় তিনি যেন সময়েরই কোনো অংশ, ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া এক অধ্যায়।
নাম তার মন্তু মিয়া। প্রতিদিন রাত দশটার ট্রেনটা সে দেখতে আসে। কেউ ভাবতে পারেন, নেহাতই অভ্যাস; কিন্তু গল্পটা ঠিক তেমন নয়। চল্লিশ বছর আগে, এই স্টেশনেই সে শেষবারের মতো বিদায় দিয়েছিল একজনকে, তার ভালোবাসার মানুষকে। তার নাম মিতু। গ্রামের স্কুলে একসাথে পড়তেন। মিতু ছিল চঞ্চল, চোখে স্বপ্ন ভরা এক মেয়ে, যে সবসময় বলত ”আমি শহরে গিয়ে ডাক্তার হয়ে, তারপর ফিরে আসব।”
একদিন ঠিক এই প্ল্যাটফর্মেই, ট্রেনের জানালার ফাঁক দিয়ে, মিতু বলেছিল, “ফিরে আসব মন্তু মিয়া, অপেক্ষায় থেকো।” সেই থেকে মন্তু মিয়ার অপেক্ষার প্রহর শুরু হয়। কিন্তু মিতু আর ফেরে না। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেবার, যোগাযোগ ছিলো বিচ্ছিন্ন, খোঁজও মেলেনি মিতুর। এর মধ্যেই চারপাশটা কেমন যেন বদলে গেল, শহর বদলে গেল, গ্রাম বদলে গেল, মানুষগুলোও ঠিক আগের মতো নেই, যেন বদলের খেলায় বিভোর! সবই বদলে গেল, তবু মন্তু মিয়ার অপেক্ষার প্রহর আজও বদলায়নি।
লোকজন বলে, সে পাগল হয়েছে। কেউ কেউ করুণার চোখে দেখে, কেউ-বা হাসে। কিন্তু মন্তু মিয়ার কাছে স্টেশন মানেই এক বুক আশা। কেউ আসবে হয়তো! এক সীমাহীন প্রতীক্ষা তার! সেদিন রাতেও-নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন আসে, ঠিক যেমন গত চল্লিশ বছর ধরেই আসছে। সিটি বাজে, ট্রেন থামে, দরজা খুলে যায়, যাত্রীরা নামে, কেউ কেউ উঠে যায়। মন্তু মিয়া বিষণ্ন চোখে তাকায় প্রত্যেক মুখের দিকে, পরিচিত সেই মুখচ্ছবি হয়তো ভেসে উঠবে চোখের সামনে তাই ভেবে। একটি মুখ খুঁজে বেড়ান, যা গত জীবনভর চোখে গেঁথে আছে। হঠাৎ করেই একটি মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। বয়স বড়জোর বিশ-পঁচিশ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, পরনে আধুনিক পোশাক, চেহারায় মৃদু চঞ্চলতা।
সে নিচু গলায় বলে, “চাচা, আপনি কি মন্তু মিয়া?”
মন্তু মিয়া কিছুটা অবাক হয়ে তাকান। চোখ সরু হয়ে আসে। মুখে চিন্তার রেখা।
মেয়েটি ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে আবার বলে, “আমার মা বলতেন, আপনি তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছেন। আমার মায়ের নাম- মিতু। তিনি আর আসতে পারেননি, তবে আমি এসেছি।”
মন্তু মিয়ার চোখে জল জমে ওঠে। সেদিন কেন জানি- স্টেশনের বাতিগুলো আরও উজ্জ্বল মনে হয় তার কাছে ; যেন, কিছুক্ষণের জন্য হলেও সময় থমকে আছে! সময়ের চাকা যেন থেমে যায় সেই মুহূর্তে। মন্তু মিয়া কিছু বলতে পারেন না। শুধু চেয়ে থাকেন মেয়েটির চোখে সেই চোখে একটুকরো মিতুর ঝলক খুঁজে ফেরেন। একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে। বুকের ভেতর জমে থাকা পাহাড়টা যেন একটু নড়ে ওঠে।
স্টেশনের বাতিগুলো হঠাৎ করেই আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেন রাতের অন্ধকারের মাঝেও একটি আলো ফুটে ওঠে আশার আলো, পূর্ণতার আলো। সেই রাতে মন্তু মিয়া মেয়েটির সাথে পায়ে পা মিলিয়ে বাড়ি ফেরেন, তাদের পেছনে পড়ে থাকে ধূলিধূসর একটি ইস্টিশন এবং হাজারো পদচিহ্নের স্মৃতি! কিন্তু তার পরেও এই প্রথমবার তার বুকে একটু শান্তির ছায়া নামে। মনে হয় যেন, সকল প্রতীক্ষারই শেষ আছে, যদি তাতে ভালোবাসা থাকে।