কীর্তনখোলা রিপোর্ট
ঝালকাঠির নলছিটিতে স্কুলছাত্র, বরগুনায় গরু ব্যবসায়ীর মাথাবিহীন লাশ, বাউফলে মুক্তিযোদ্ধার পচাগলা লাশ ও রাঙ্গাবালিতে এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় ইভা আক্তার (১৩) নামে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার (৭ জুন) রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার শেকড়কাঠি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ইভা আক্তার ওই গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. শহিদ সিকদারের মেয়ে এবং জুরকাঠি জেড.এ. ভুট্টো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রবিবার রাতে ইভাকে ঘরে রেখে তার মা আছমা বেগম পাশের ঘরে যান। এ সময় ঘরের বারান্দার আড়ার সঙ্গে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস দেয় ইভা। কিছুক্ষণ পর তার বাবা শহিদ সিকদার বরিশাল থেকে বাড়ি ফিরে মেয়েকে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া পাননি। পরে স্ত্রীকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে ইভাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করা হলেও তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হন স্বজনরা।
নিহতের চাচা আব্দুর রশিদ সিকদার জানান, আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে পরিবার কিছুই জানে না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইভার কোনো বিরোধ বা কথাকাটাকাটির ঘটনাও ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন। খবর পেয়ে নলছিটি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। নলছিটি থানার ওসি (তদন্ত) মো. আশরাফ আলী জানান, স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে বরগুনা সদর উপজেলার গৌরীচন্না খাল থেকে মো. শামীম বেপারী (৪০) নামে গরু ব্যবসায়ীর মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গৌরীচন্না বাজার সংলগ্ন ব্রিজের পশ্চিম পাশের খালের কচুরিপানার ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। স্থানীয়রা জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খালের পাশে রক্তমাখা জামা ও জুতা পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে বরগুনা সদর থানা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি শুরু করে। একপর্যায়ে খালের কচুরিপানার মধ্যে থেকে মাথাবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহটি শামীমের বলে শনাক্ত করেন তার স্বজনেরা।
শামীমের বাবা মনসুর আলী বেপারী জানান, শামীম রোববার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়ে গৌরীচন্না বাজারে যায়। রাত ১১টার পর তার মোবাইল ফোন সেট বন্ধ থাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তারা। তবে কী কারণে শামীমকে হত্যা করা হয়েছে বা কারা হত্যা করেছে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেনি তার বাবা।
বরগুনা থানার ওসি আব্দুল আলীম বলেন, সুরতহাল শেষে মরদেহ মর্গে পাঠানো হবে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে গোয়েন্দা তৎপরতার পাশাপাশি পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
এছাড়া পটুয়াখালীর বাউফলে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের পচাগলা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার নিজ বাসা থেকে এ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন ধরে সিরাজুল ইসলামের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছিল না। রোববার (৭ জুন) তার বাসা থেকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে তারা দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে তাকে একটি চেয়ারের ওপর বসা অবস্থায় মৃত দেখতে পান। পরে স্থানীয়রা লাশ উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর অন্তত দুই দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই সময় চেয়ারে বসা অবস্থায় লাশের পায়ের নিচে ফ্লোরে প্রচুর রক্ত পড়ে ছিল। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের সন্তানরা সবাই চাকরিজীবী। ছেলে সোহাগ বাংলাদেশ বেতারে কর্মরত, আরেক ছেলে শহিদুল একটি ব্যাংকে চাকরি করেন এবং মেয়ে ইসরাত জাহান ঢাকায় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্ত্রী নুরজাহান বেগমও সন্তানদের সঙ্গে ঢাকায় অবস্থান করতেন। ফলে সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে প্রায় একাই বসবাস করতেন। মাঝে মাঝে ঢাকাতে যেতেন সন্তানদের কাছে।
স্থানীয়দের মতে, পরিবারের সদস্যরা কর্মব্যস্ততার কারণে ঢাকায় থাকলেও বৃদ্ধ এই মুক্তিযোদ্ধা নিজ বাড়িতেই সময় কাটাতেন। তার এমন নিঃসঙ্গ মৃত্যু এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের ছেলে শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমি চাই না আমার বাবাকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ হোক। বাবা শুধু বাউফলেই থাকতেন না, তিনি ঢাকা ও বাউফল দুই জায়গাতেই সময় কাটাতেন। আমরা সবাই চাকরিসূত্রে ঢাকায় অবস্থান করি। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় চিকিৎসা গ্রহণের পর বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানেই এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।’ বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। এ ছাড়া তার পায়ে একটি সংক্রমণ ছিল। পুলিশি আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববার রাতেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামকে দাফন করা হয়েছে।’
অপরদিকে মায়ের করা মামলায় বাবা কারাগারে, মা অবস্থান করছিলেন নানা বাড়িতে। আর একাই বসতঘরে থাকত ১৬ বছরের কিশোর তুহিন হাওলাদার। সোমবার (০৮ জুন) দুপুরে সেই ঘর থেকেই তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের পুরাতন বাজার সংলগ্ন এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তুহিনের বাবা মনির হাওলাদার ও মা শেফালী বেগমের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বিরোধ চলছিল।
২০২৫ সালের শেষ দিকে শেফালী বেগম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করলে মনির হাওলাদারকে কারাগারে যেতে হয়। ওই মামলায় তিনি এর আগে প্রায় দেড় মাস কারাভোগ করেন। সর্বশেষ কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ আগে আবারও কারাগারে যান। বর্তমানে তিনি কারাগারেই রয়েছেন। অন্যদিকে তুহিনের মা দক্ষিণ চরমোন্তাজে তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ফলে তুহিন বাড়িতে একাই থাকত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পরিবারটির তিন সন্তানের মধ্যে তুহিন ছিল বড়। তার দুই ছোট বোনও মায়ের সঙ্গে নানা বাড়িতে ছিল। প্রতিবেশীরা জানান, সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে তাদের সন্দেহ হয়। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে ঘরের ভেতরে গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় তুহিনের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে কেউ দরজা খোলা দেখেছেন, আবার কেউ বলছেন দরজা বন্ধ ছিল। তুহিনের মা শেফালী বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আমাকে কিছুই বলেনি। তার সঙ্গে কোনো কথাও হয়নি। মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিল। আমার মেয়ে আমাকে বলছিল, ভাইয়ের মোবাইল বন্ধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘কে জানি তার গাড়ি আটকেছিল। এর সপ্তাহখানেক আগে বাজারের এক ঘরে রাতে ঢুকেছিল। মেম্বারে (ইউপি সদস্য) সালিশিও করছে।’ তবে কিশোরটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। চরমোন্তাজ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ বেলাল হোসেন বলেন, ‘সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তুহিনের বাবা ও মায়ের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিলো না। মায়ের মামলায় বাবা কারাগারে আছে।