কীর্তনখোলা রিপোর্ট

বরিশালে নির্বাচনী মাঠে এবার যে প্রবণতাটি আলাদা করে নজরে পড়ছে, তা শুধু প্রার্থীর সংখ্যার হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। সংখ্যার আড়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বড় রাজনৈতিক শূন্যতা। সেই শূন্যতার ভেতরই জায়গা করে নিচ্ছে ইসলামপন্থী রাজনীতি।

এই প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্নটি আর সরল থাকে না, তা হলো- এটি কি সত্যিই ইসলামন্থী রাজনীতির সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত হওয়ার ইঙ্গিত, নাকি প্রচলিত দলগুলোর দুর্বলতা আর অনুপস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে ধরে মাঠে নামার কৌশল। ২১টি সংসদীয় আসনে বরিশাল বিভাগে প্রার্থী ১৩১ জন। এর মধ্যে সাতটি ইসলামী ঘরানার দলের প্রার্থী ৪৯ জন। সংখ্যাটাকে অনুপাতের হিসাবে ধরলে চিত্রটি গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশে। অর্থাৎ বরিশাল বিভাগের নির্বাচনী মাঠে প্রতি তিনজন প্রার্থীর একজনের বেশি ইসলামী ঘরানার দল থেকে। অপর প্রার্থীরা পাঁচটি স্বতন্ত্র ও ১৭টি দলে।

আরো ভেঙে দেখলে বোঝা যায়, এই ৪৯ জনের বড় অংশই এসেছে দুটি দল থেকে। জামায়াতে ইসলামীর ১৯ জন, অর্থাৎ প্রার্থীর প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১৮ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। শুধু এই দুই দল মিলিয়ে দাঁড়াচ্ছে মোট প্রার্থীর প্রায় ২৮ শতাংশ। সেখানে বিএনপির ১৯ জন প্রার্থী মোট প্রার্থীর প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ছোট ইসলামপন্থী দলগুলোর কৌশলগত অবস্থান খেলাফত আন্দোলনের দুই অংশের সাতজন প্রার্থী মোটের প্রায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বাকি চারটি দল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ এবং ইসলামী ফ্রন্টের পাঁচজন প্রার্থী, যা মোটের প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এই অনুপাত দেখাচ্ছে দুটি বিষয়। একটি হচ্ছে ইসলামী ঘরানার রাজনীতিতে নেতৃত্বের কেন্দ্র এখনও মূলত জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের হাতেই। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ছোট ইসলামপন্থী দলগুলোর উপস্থিতি সংখ্যায় কম হলেও মাঠে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন তাঁরা। এই ৩৭ শতাংশ প্রার্থীসংখ্যা বলছে, বরিশালের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামপন্থী দলগুলো আর প্রান্তিক নয়। তবে এই অনুপাত ভোটের বাক্সে কতটা রূপ নেবে সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। সংকুচিত মাঠ, ত্রিমুখী লড়াই এই চিত্রকে আলাদা করে দেখার কারণ রয়েছে। এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি বড় নাম ব্যালটে নেই। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত। তারা মাঠের বাইরে। আরো আটটি দল প্রার্থীই দেয়নি। ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ৫১টি দলের মধ্যেও বাস্তব লড়াই সীমিত হয়ে পড়েছে।

তবে বরিশালে মাত্র ২৪টি দল তাদের প্রাথী দিয়েছে। তবে দুটি স্বতন্ত্রসহ হাতে গোনা সীমিত সংখ্যক পরিচিত দলের মধ্যে এবারের ভোটযুদ্ধ সীমাবদ্ধ থাকছে। বরিশালে রাজনৈতিক দলের এই সংকোচন সবচেয়ে স্পষ্ট। বিএনপি দিয়েছে ২০ জন প্রার্থী। জামায়াত ১৯ জন, ইসলামী আন্দোলন ১৮ জন। এই তিনটি দল মিলিয়েই প্রায় অর্ধেক প্রার্থী। বাকি অর্ধেক আরো ২১টি দল ও পাঁচজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। সংখ্যায় বহুদলীয় হলেও শক্তির বিচারে নির্বাচনটি ক্রমে ত্রিমুখী হয়ে উঠছে। ক্ষমতার শূন্যতার রাজনীতি প্রবীণ সাংবাদিক লেখক আনিসুর রহমান খান স্বপন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী রাজনীতির উপস্থিতি শুধু ধর্মীয় আবেগের প্রশ্ন নয়, এটি ক্ষমতার শূন্যতার রাজনীতি। আওয়ামী লীগ না থাকায় যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানে কারা কতটা জায়গা নিতে পারে, সেটিই এখন পরীক্ষার বিষয়। ইসলামী দলগুলো সংগঠিতভাবে সেই পরীক্ষায় নেমেছে। তারই অংশ হিসেবে জোটভুক্ত হয়ে ভোটের মাঠে থাকার চেষ্টা করছে দলগুলো।

তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। তাদের মধ্যকার জোট না থাকলে একাধিক আসনে মুখোমুখি হবেন এ দুই দলের প্রার্থীরা। একই ভোটব্যাংক, একই সামাজিক বলয়, কিন্তু তাদের কৌশল ভিন্ন। টিআইবির অনুপ্রেরণায় গঠিত সনাকের সদস্য কবি হেনরী স্বপন বলেন, জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্কে ভরসা রাখছে। ইসলামী আন্দোলন জোর দিচ্ছে নৈতিকতা, দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য আর ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর। দুই দলের সমন্বয় ভোটের মাঠে বিপাকে ফেলতে পারে বিএনপিকে। ভোট ভাগের অঙ্ক ও বাস্তবতা রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাড. এ কে আযাদের মতে, খেলাফত আন্দোলন ও ছোট ইসলামী দলগুলোর অবস্থান আরো কৌশলগত। তাদের প্রার্থী সংখ্যা কম, এমনকি প্রচারও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রচারণা জয়কেন্দ্রিক নয়। বরং ভোটের শতাংশ জানা, পরিচিতি ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ সমীকরণে দরকষাকষির জায়গা তৈরি করাই  ইসলামন্থী ছোট দলগুলোর মূল লক্ষ্য। সুশাসনের জন্য নাগরিক বরিশালের সম্পাদক ও নিবাচনী পর্যবেক্ষক রফিকুল আলম বলেন, ভোট ভাগের অঙ্ক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই আসনে একাধিক ইসলামপন্থী প্রার্থী থাকায় ভোট ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে সরাসরি লাভবান হতে পারে বিএনপি। আবার কোথাও কোথাও ইসলামপন্থীদের ভোট একত্র হলে ফল পাল্টে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না এই পর্যবেক্ষক। গ্রামাঞ্চলের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রান্তিক ভোটারদের অনেকেই বলছেন দল নয়, মুখই অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের কেন্দ্র। ইসলামী পরিচয় থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় ভূমিকা আর সামাজিক সম্পর্ক ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এতে ইসলামপন্থী রাজনীতির ‘সম্মিলিত উত্থানএর ধারণা বাস্তবে খানিকটা ভেঙে যেতে পারে। সে কারণেই জোটের প্রার্থীরা ব্যক্তি ইমেজের কাছে হেরে যেতে পারেন। পরিসংখ্যান অনুযাী বলা যায়, ৩৭ শতাংশ প্রার্থী কোনোভাবেই প্রান্তিক পর্যায়ের উপস্থিতি নয়। এটি দেখাচ্ছে বরিশালের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী দলগুলো এখন দৃশ্যমান শক্তি। এই শক্তি ব্যালট বাক্সে রূপ নেবে, নাকি এটি থাকবে বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্তের পরিসংখ্যান হয়ে- সেই উত্তর মিলবে ভোটের ফলে। তবে এটুকু স্পষ্ট, এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থী রাজনীতি আর প্রান্তে নেই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘আগামীর বাংলাদেশ হবে ইসলামের বাংলাদেশ। তাই ইসলামের পক্ষের সব ভোট দিতে হবে এক বাক্সে। এই প্রচারণার পর সমমনা আটটি দল জোট বেঁধেছিলাম। পরে জোটের আকার বেড়েছে। সব কিছু বিবেচনায় রেখেই ইসলামী দলগুলো প্রার্থী দিয়েছে। তারা এক বাক্সে ভোট দিতে পারলেই  দলগুলোর বিজয় নিশ্চিত হবে।
বিজ্ঞাপন
Advertisement