মৌমিতা বিনতে মিজান

“স্যার! (মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা), এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার! আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিলো সবাই তো মরে গিয়েছে। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত”।

আপনারাও প্রকৃতির নিয়মে একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন। ন্যায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। প্রকৃত সম্মান এবং শ্রদ্ধা পাবেন। মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেঁচে থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে। অন্তত একজন ‘শামসুজ্জোহা’ হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের।”

এটি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ১৫ জুলাই ২০২৪ তারিখে ঊনসত্তরের গনঅভ্যুত্থানে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ শামজুজ্জোহাকে উদ্দ্যেশ্য করে লিখেছিলেন।  

১৬ জুলাই সারাদেশের মতো রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের সহিংসতার ঘটনা ঘটে।  ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্হান নেয়। এসময় অনেক ছাত্ররা সরে গেলেও একজন ছাত্র সরেননি। শহীদ শামসুজ্জোহার আদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্রটি মেরুদণ্ড সোজা করে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। হাতে একটি লাঠি নিয়ে দুহাত প্রসারিত করে প্রতিবাদী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলেন। আনুমানিক ৫০-৬০ ফুট দূরত্ব থেকে পুলিশ ছররাগুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হন ছেলেটি। প্রথমে হয়তো বিশ্বাস করতে পারেননি যেই রাষ্ট্রের সরকারি বাহিনীর  বেতন হয় সেদেশের সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকায়,  যে বুলেট কেনা হয় জনগনের শুল্ক, কর ও ভ্যাটের টাকায়। সেই বুলেট কিনা নিজের দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অবলীলায় সাধারণ শিক্ষার্থীর বুকে ছুড়তে পারে! দ্বিতীয়বার গুলিবিদ্ধ হবার পর বুঝতে পারেন। কিন্তু তখনও তার চোখেমুখে যেনো অবিশ্বাসের ছাপ। বুকে ও পিঠে ধাতব ছররা গুলি তার হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও তলপেটে আঘাত হানে। নিভে যায় এক স্বপ্নবাজ যুবকের প্রাণ। এই ছেলেটির নাম আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম শহীদ। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে জন্ম নেয়া আবু সাঈদ ছয় ভাই আর তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। এসএসসি ও এইচএসসিতে যথাক্রমে গোল্ডেন জিপিএ-৫ ও জিপিএ -৫ পেয়ে ২০২০ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ক্ষণজন্মা এই মেধাবী তরুন। যিনি মরে গিয়েও অমর। যার নামটি বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনটি ছিলো মূলত বাংলাদেশে সকল ধরনের সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্হার সংস্কারের দাবি। ঐ বছরের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারিকৃত পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা পদ্ধতির সংস্কার আন্দোলন আবার নতুনভাবে আলোচনায় আসে। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে উক্ত পরিপত্র জারি করা হয়েছিলো। ওই পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নবম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম-১৩ তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সকল কোটা বাতিল করা হয়েছিলো। ২০২৪ এর ৫ জুন হাইকোর্টের রায়-এ ক্ষোভে ফুসে ওঠে চাকরি প্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা কোটা সংস্কারের দাবিতে একত্রিত হন এবং বিক্ষোভ করেন। কিন্তু এসময় ঈদুল আযহার ছুটির কারনে আন্দোলন স্হগিত হয়। 

১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে এবং তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরমধ্যেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্হানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। ১০ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্হাগারের সামনে জড়ো হয়ে শাহবাগে পৌঁছলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে শিক্ষার্থীদের সামনে ব্যারিকেড নিয়ে অবস্হান করে। ১১ জুলাই থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা  আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা হামলার শিকার হন। ১৫ জুলাই কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল, সূর্যসেন হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় তৎকালীন ছাত্রলীগ।  এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।  নারী শিক্ষার্থীদের উপর রড,লাঠি, হকস্টিক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে তৎকালীন ছাত্রলীগ।  এসময় শাহবাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জলকামান নিয়ে পুলিশকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। নিমিষেই আন্দোলন ছড়িয়ে পরে গোটা দেশজুড়ে।  সারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।  

বিজ্ঞাপন
Advertisement