কীর্তনখোলা রিপোর্ট

নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি, ঘরবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগত ৩৮ বছরের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদীভাঙনের কারণে বরিশালের ভৌগোলিক মানচিত্র ক্রমেই ছোট হয়ে আসছেবর্তমানে বরিশাল বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মারাত্মক ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে

পরিবেশ গবেষক ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরেই বিভাগের অন্তত ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছেসচেতন মহলের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছেনগত ৩০ বছর ধরে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে বরিশালের হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়ন

সরেজমিনে কথা হয় উপজেলার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ মোল্লার সঙ্গেমেঘনার বিশাল জলরাশির দিকে তাকিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেন হারিয়ে যাওয়া বসতভিটার কথাঅশ্রুসজল চোখে নুর মোহাম্মদ মোল্লা বলেন, যে মাটিতে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, আজ তার পুরোটাই মেঘনা নদীর গর্ভেপাকা ঘরবাড়ি, ধানি জমি, বাপ-দাদার ভিটে; সবকিছুই চোখের সামনে তলিয়ে গেছেএকই এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বেগমের আশঙ্কা, নদী যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত বাঁধ না দিলে পুরো ইউনিয়নই একদিন মানচিত্র থেকে মুছে যাবে

মফিজুল ইসলাম বলেন, ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ চাইশুধু মেঘনাই নয়, কীর্তনখোলা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা, তেঁতুলিয়া, কারখানা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বরিশালের বিস্তীর্ণ এলাকাকীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরবাড়িয়া এলাকার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনকসেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরও গত বর্ষা মৌসুমে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে

চরবাড়িয়ার বাসিন্দা আবদুল খালেক মিয়া বলেন, নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছেতিনবার বাড়ি হারিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলামএখন এই জায়গাটাও ভাঙনের মুখেদ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের নদীতে ডুবে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না১৯৮৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের পর বছর নদীভাঙনের কারণে সংকুচিত হচ্ছে বরিশালের মানচিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন এই ঝুঁকিকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেফলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরও অনেক এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিচ্ছেবাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই প্রতি বছর বরিশালে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছেনপানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ১০২ কিলোমিটার বাঁধ বর্তমানে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বরিশাল বিভাগ (দক্ষিণাঞ্চল)-এর প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আমরা চিহ্নিত করেছিজরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধের পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছেঅনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে

বিজ্ঞাপন
Advertisement