দশমিনা প্রতিনিধি

গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৩ আসনের নির্বাচন দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার পর এখন প্রতিযোগিতা এসে দাঁড়িয়েছে একটিমাত্র সমীকরণে—আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে যাবে। যদিও আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, তবুও এ আসনের সবচেয়ে সংগঠিত ও প্রভাবশালী ভোটব্যাংক হিসেবে তাদের সমর্থকরাই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ভোট নিজেদের দিকে টানতে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (বহিষ্কৃত) স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন।

স্থানীয়দের মতে, হাসান মামুনের পক্ষে রয়েছে ‘সরব ভোট’, যারা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ ও প্রচারণায় সক্রিয়। অন্যদিকে ভিপি নুরের শক্তি ‘নীরব ভোটারদের’ মধ্যে, যারা প্রকাশ্যে অবস্থান না নিলেও ভোটের দিন নীরবে সমর্থন দিতে পারেন। এই নীরব ও সরব ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নির্বাচনের গতি অনিশ্চিত করে তুলেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক যিনি নিজের পক্ষে নিতে সক্ষম হবেন, শেষ পর্যন্ত জয় তার দিকেই যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবাধীন ছিল এ আসন। তবে এবার রাজনৈতিক চিত্র পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি এ আসনে নিজস্ব প্রার্থী না দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নুরকে সমর্থন দিয়েছে। এতে নুর বিরোধী রাজনীতির প্রতীকী মুখ হয়ে উঠলেও তার পথ সহজ নয়। কারণ একই রাজনৈতিক বলয়ের ভেতর থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন হাসান মামুন। দুই উপজেলার বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী হাসান মামুনের পক্ষেই কাজ করছেন। তবে এই দুই প্রার্থীর প্রতিযোগিতা এসে ঠেকেছে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের কাছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের ভোট এখন কার্যত উন্মুক্ত। এই ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে দুই প্রার্থীই ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছেন। সভা-সমাবেশে উন্নয়ন ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রসঙ্গ তুলে তারা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন।

গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা হলে তারা জানান, গত এক মাস ধরে দুই প্রার্থীর পক্ষ থেকেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না এবং নির্বাচনের পরও একসঙ্গে কাজ করা হবে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, দল নির্বাচনে না থাকায় তারা ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এ আসনের অধিকাংশ মানুষই তাদের সমর্থক। কিছু মানুষ ভোট দিলেও যারা সরকার পতনের পর কোনো ধরনের মামলা বাণিজ্য বা হয়রানিতে জড়িত ছিল না এবং ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ হবে না—এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবে।

দশমিনা উপজেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি রুহুল আমিন মোল্লা বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর যেসব মামলা হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইতোমধ্যে সেসব মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে। দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। হাসান মামুন গণমানুষের প্রার্থী, এ আসনে আওয়ামী লীগের শতভাগ ভোট তিনি পাবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। তিনি কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি। আওয়ামী লীগের তৃণমূল সমর্থকরাও এখন তার প্রচারণায় মাঠে কাজ করছেন। নুরুল হক নুরের মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়ক আবু নাঈম বলেন, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর গণঅধিকার পরিষদ বা নুরুল হক নুরের নেতাকর্মীদের দ্বারা আওয়ামী লীগের কোনো সমর্থক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং তাদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কাজ করা হয়েছে। নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩ থেকে নির্বাচিত হলে সব মত ও পথের মানুষের জন্য এলাকা নিরাপদ থাকবে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই তিনি বলে আসছেন—সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া নিরীহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হয়রানি করা উচিত নয়। একাধিক সভা-সমাবেশেও তিনি বলেছেন, ভোট দেওয়া সবার নাগরিক অধিকার। সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগসহ সব দলের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আসতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই এবং তিনি স্বতন্ত্র, তাই শান্তিপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে তাদের ভোট তার প্রাপ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আওয়ামী লীগসহ সব দলের সমর্থক ও সাধারণ মানুষ তাকে ভোট দেবেন।

বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মামলা বাণিজ্যের ঘটনা ঘটলেও গলাচিপা-দশমিনায় তেমন হয়নি। যতটুকু হয়েছে তা কিছু পেশিশক্তিধর ব্যক্তি করেছে এবং তারা বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছে। আমাদের দ্বারা কারো ক্ষতি হয়নি। বরং দখলদার ও চাঁদাবাজদের হাত থেকে সবাইকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, ঢাকসুর ভিপি হওয়ার আগে ও পরে বহুবার হামলা-মামলার শিকার হলেও তিনি কখনো কারও বিরুদ্ধে মামলা করেননি।

নুর আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে বাড়িতে গিয়ে দশমিনা-গলাচিপার নেতাকর্মীদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে রক্তাক্ত হয়েও তিনি মামলা করেননি। এখনো পর্যন্ত থানায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেননি; বরং নিরীহ কাউকে হয়রানি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ভোটের মাঠে রয়েছে। যেহেতু তিনি কারও ক্ষতি করেননি, তাই আগামী পাঁচ বছর নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে এবং গলাচিপা-দশমিনাকে রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে তারা তাকে ভোট দেবেন—এ বিষয়ে তিনি শতভাগ নিশ্চিত।

বিজ্ঞাপন
Advertisement