পটুয়াখালী প্রতিনিধি

নৌকা নেই, ধানও নেই—পটুয়াখালী-৩ ((গলাচিপা-দশমিনা)) আসনে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এই আসনে এবার দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে শূন্যতা। সেই শূন্যতা দখলের প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে পড়েছেন একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। ফলে ভোটের হিসাব হয়ে উঠেছে জটিল, অনিশ্চিত এবং সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ।

গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার, নদীর পাড় ও জনপদজুড়ে এখন ব্যানারুফেস্টুন ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকা। নৌকা বা ধান প্রতীক না থাকলেও চারটি প্রতীককে ঘিরে প্রচারণা তুঙ্গে। রোববার দুপুরে গলাচিপা ও দশমিনার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের ভোট অনেকাংশেই নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের অবস্থান ও সিদ্ধান্তের ওপর।

তেঁতুলিয়া ও আগুনমুখা নদীবেষ্টিত পটুয়াখালীর পূর্ব সীমান্তঘেঁষা এই আসনে এবারের নির্বাচন চার মেরুতে বিভক্ত। পটুয়াখালী-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চার প্রার্থী। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার বিপরীতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নির্বাহী সদস্য হাসান মামুন ঘোড়া প্রতীকে মাঠে রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক শাহ আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মুফতি আবু বকর সিদ্দীক হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে আছেন।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় হাসান মামুনকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে, নুরুল হক নুর বিএনপির সমঝোতার প্রার্থী হলেও তার অতীত রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। এসব কারণে ভোটের মাঠে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে নুর ও মামুনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। সর্বশেষ শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের চত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন। আহতদের কয়েকজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তা একই দিন ও একই স্থানে কর্মসূচি পালনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কয়েকটি কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই কড়াকড়িতে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলার ৫১৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৫৩টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নুর ও মামুনের প্রকাশ্য টানাপোড়েনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রচারণা তুলনামূলকভাবে নীরব রয়েছে। বিএনপির ভেতরেও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী শুরু থেকেই দ্বিধায় রয়েছেন।

দশমিনা শ্রমিক দলের এক নেতা বলেন, দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনেকেই ট্রাক প্রতীকে ভোট দেবেন। আবার কিছু নেতাকর্মী ঘোড়া প্রতীকের পক্ষে কাজ করছেন। তবে তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো এটি আওয়ামী লীগের এলাকা, এখানে ভোটের হিসাব এতটা সহজ নয়। এদিকে আওয়ামী লীগের কিছু নীরব সমর্থক হুমকি ও চাপের অভিযোগ তুলে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার কথাও ভাবছেন বলে জানান। এতে ভোটের উপস্থিতি ও ফলাফল—দুটিই প্রভাবিত হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বিজ্ঞাপন
Advertisement