কীর্তনখোলা রিপোর্ট

বরিশালে বোরো মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। ফলে বোরো চাষে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে সেচ, কীটনাশক ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে লাভের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেকে বোরো আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন। রোববার বরিশালের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন ও কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য জানা গেছে।বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের চিনিবাড়ী গ্রামের কৃষক মো. সেলিম এ বছর ২৫ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। নিজ এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, লাভ কম হওয়ায় অনেক কৃষক বোরো চাষের পরিমাণ কমিয়েছেন, কেউ কেউ একেবারেই চাষ করছেন না। সেচ, সার ও ওষুধের ব্যয় বহন করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বোরো মৌসুমে জমিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরিয়া ও ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের প্রয়োজন হয়। কৃষকদের এসব সার ডিলার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। বেশি জমিতে আবাদ করা কয়েকজন কৃষক জানান, তাঁরা প্রতি ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনছেন। একই ওজনের ডিএপি সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ টাকায়। এতে ইউরিয়ার প্রতি কেজি দাম দাঁড়ায় ২৯ টাকা এবং ডিএপির প্রতি কেজি ২৫ টাকা। অথচ সরকার ইউরিয়ার দাম প্রতি কেজি ২৭ টাকা এবং ডিএপির দাম ২১ টাকা নির্ধারণ করেছে। সাবডিলার বা স্থানীয় বাজার থেকে কিনলে দাম আরও বেশি পড়ছে।

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ও উজিরপুরের ধামুরা এলাকায় প্রায় ২৫ একর জমিতে বোরো আবাদ করছেন কৃষক সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতি বস্তা ইউরিয়া কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৬০ টাকায় এবং ডিএপির বস্তা ১ হাজার ২৫০ টাকায়। সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে এখন বোরো চাষে তেমন লাভ থাকছে না। তবুও দীর্ঘদিনের পেশা হওয়ায় কৃষিকাজ ছাড়তে পারছেন না। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। বরিশাল জেলায় আবাদ হয়েছে ৬২ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধানের চারা রোপণ শেষ হয়েছে, আবার কোথাও রোপণ কাজ চলমান। কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে সব খরচ মিটিয়ে লাভ হবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন। বরিশাল সদরের করমজা এলাকার কৃষক গিয়াস উদ্দিন এ বছর সাত একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি একরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু সমপরিমাণ ধান উৎপাদন হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, পাম্প থেকে কৃষকদের সরাসরি ডিজেল বিক্রি করা হয় না; বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয় এবং অনেক সময় পরিমাণেও কম দেওয়া হয়। তিনি জানান, দুজন সার ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা সরবরাহ না থাকার কথা বলেছেন। ফলে বাইরে থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। গত তিন-চার বছরে কীটনাশকের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে—যে ওষুধ আগে ১০০ টাকা ছিল, এখন তা ২৫০ টাকা। সরকার বা কৃষি অফিস এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নিজের বোরো খেতে আগাছা পরিষ্কার করতে থাকা কৃষক আবদুল বারেক জানান, তিনি বোরো চাষের পরিমাণ কমিয়েছেন। পরিবারের চাহিদা মেটাতে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই আবাদ করছেন। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকের মজুরি, সারের দাম ও অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে; অথচ ফলন তুলনামূলক কম। কৃষিতে লাভ কম হলেও দীর্ঘদিনের পেশা হওয়ায় করছেন। তিনি বলেন, ১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি ১ হাজার ২৫০ টাকায় এবং ১ হাজার ২৫০ টাকার ইউরিয়া ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

তবে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বরিশাল অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক (সার ও বীজ) মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, “আমাদের সারের কোনো সংকট নেই; বরং সংরক্ষণের জায়গা সংকট। সরকার প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ডিএসপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে।” অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ দেখভাল করে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি সরদার পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে কৃষিকাজে সহায়তা করে। সে জানায়, শনিবার দেড় হাজার টাকা দিয়ে তাকে এক বস্তা ইউরিয়া ও পাঁচ কেজি ডিএসপি কিনতে পাঠানো হয়। ডিলারের কাছে গিয়ে জানতে পারে ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে বাড়ি থেকে বাড়তি টাকা এনে কিনতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement