দশমিনা প্রতিনিধি

পটুয়াখালীর দশমিনায় তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিবছর বিলীন হয় তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতবাড়িভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয় শত শত পরিবারভাঙনে নতুন করে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম উপজেলার নদীতীরবর্তী চারটি ইউনিয়নের দুই সহস্রাধিক পরিবারেরএ ছাড়াও ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেড়িবাঁধ, ব্লকসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের বাঁশবাড়ীয়া ও ঢনঢনিয়া, দশমিনা সদর ইউনিয়নের দশমিনা, হাজীরহাট, কাটাখালী, গোলখালী ও সৈয়দজাফর, রণগোপালদী ইউনিয়নের পূর্ব আউলিয়াপুর, আউলিয়াপুর, চরঘুনি ও পাতারচর, পূর্ব রণগোপালদী এবং চরবোরহান ইউনিয়নের দক্ষিণ চরবোরহান গ্রামের নদীতীরবর্তী মানুষ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে

এদিকে উপজেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত ইউনিয়নগুলোতে বেড়িবাঁধ থাকলেও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরবোরহান ইউয়িনের চতুর্দিকে নদী থাকার পরও বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে নেই কোনো বেড়িবাঁধফলে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে চলে ওই ইউনিয়নের গণমানুষের জীবন-জীবিকাজানা যায়, বছরের আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল হলেও মূলত আশ্বিন পর্যন্ত টানা চার মাস বর্ষার দাপট চলেঅপর দিকে চৈত্র-বৈশাখ থেকে বাড়তে থাকে পানির চাপএই সময়ে নদীর ভাঙনে বিলীন হয় মানুষের ভিটেমাটি আর শেষ সম্বলতাই এই সময়ে সব হারানোর শঙ্কায় দিন কাটে নদীতীরের মানুষেরভাঙনের শিকার দশমিনা সদরের হাজীরহাট লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভাঙন প্রতিরোধে প্রকল্প তৈরি আর তড়িঘড়ি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেতাৎক্ষণিক ফেলা এসব জিও ব্যাগ ভাঙনের তীব্রতার সামনে অপ্রতুল বলে মনে করেন তাঁরা

 তাঁদের মতে, এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা জলে যায়, টেকসইভাবে কাজে আসে না ভুক্তভোগী ব্যক্তিদেরওই এলাকার বাসিন্দা ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাপ-দাদার অনেক কৃষিজমি তেঁতুলিয়ার গর্ভে বিলীন হয়েছেহাজীরহাট বাজারটির অধিকাংশই নদীগর্ভে চলে গেছেস্থানীয় মুসল্লিদের আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বায়তুল ফজল জামে মসজিদের সামনের অংশের বারান্দা ইতিমধ্যে বিলীন হয়েছে তেঁতুলিয়ায়দশমিনার সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফখরুজ্জামান বাদল বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা না করে বর্ষা মৌসুমে জিও ব্যাগ ফেলে, যা রাষ্ট্রীয় অপচয়মাত্রশুষ্ক মৌসুমে ব্লক দিয়ে টেকসই বাঁধের ব্যবস্থা করলে বর্ষা মৌসুমে আমরা নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতাম

 হাজীরহাট লঞ্চঘাট বায়তুল ফজল জামে মসজিদের ইমাম মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘বলার মতো ভাষা নেইকয়েক দিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড মসজিদটি রক্ষায় ২৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকার একটি বাজেট দিয়েছেওই বাজেটে অপরিকল্পিতভাবে কাজ করার ফলে মসজিদের বারান্দা ইতিমধ্যে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছেকয়েক দিন আগে পানির উচ্চতা কম ছিলওই সময়ে দুই দিন কাজ বন্ধ ছিলসেই সময়ে কাজ চলমান থাকলে হয়তো মসজিদের বারান্দা বিলীন হতো নাতা ছাড়া মসজিদের ভেতরেও বড় বড় ফাটল ধরেছেবেড়িবাঁধের লঞ্চঘাট এলাকায় বসবাসকারী কবির বলেন, ‘সবকিছুই তো নদীতে ভেঙেচুরে চলে গেছেএখন কোনোরকম একটা ছাপড়া করে নদীতীরে বসবাস করছিজানি না এবার বর্ষায় এটা টিকিয়ে রাখতে পারব কি নাউপজেলার বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের ঢনঢনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোশারেফ হোসেন রাড়ি বলেন, ‘নদীভাঙন নিত্যদিনের ঘটনা

গত ১০ বছরে তিনবার বসতভিটার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছেতারপরও নদী আমাদের পিছু ছাড়ছে নাআবার ভাঙনের কবলে পড়লে কোথায় যাব জানি নাশুধু কবির কিংবা মোশারেফ নয়, এমন শঙ্কায় উপজেলার নদীতীরবর্তী ওই চার ইউনিয়নের অন্তত দুই সহস্রাধিক পরিবারভুক্তভোগী ব্যক্তিদের দাবি, কর্তৃপক্ষ ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসে নাএখন স্থায়ী সমাধান দরকারটেকসই বেড়িবাঁধ ও স্থায়ী ব্লক ছাড়া তেঁতুলিয়ার ভাঙন রোধ সম্ভব নয়পাউবো পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাজীরহাট এলাকায় মসজিদ ও মসজিদের পাশেই বেড়িবাঁধ রক্ষার্থে ৬০ লাখ টাকার বরাদ্দে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলমান রয়েছেপটুয়াখালী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ‘পটুয়াখালীতে নদীর অভাব নাইনদীর দুই তীর ব্যাপক ভাঙেআসলে সব জায়গায় কাজ করার মতো সক্ষমতা এখনো আমাদের নাইযেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ যেমন মসজিদ, বেড়িবাঁধ, স্কুলএগুলোতে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিবাকি ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো আমি অলরেডি ভিজিট করছিওগুলোতেও ব্যবস্থা নেবএ ছাড়া আমাদের একটা প্রকল্পের জন্য নদীর সমীক্ষা চলমান আছেওই সমীক্ষা প্রতিবেদনের পরে আমরা একটা বড় প্রকল্প দেবআপাতত বর্ষার সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা বেড়িবাঁধ যাতে না ভাঙে, সে জন্য আমরা তৎপর রয়েছি

উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরবোরহান ইউনিয়নের বিষয়ে রাকিব বলেন, ‘নতুন বেড়িবাঁধ করতে গেলে নতুন প্রজেক্ট লাগবে, নতুন সমীক্ষা লাগেআমাদের যে সমীক্ষা চলমান রয়েছে, সেটিতে চরবোরহান রাখছিসমীক্ষা করে থার্ড পার্টিতারা যে সুপারিশ দেবে, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করবপ্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, ‘নদীভাঙনকবলিত এলাকার কাজ শুষ্ক মৌসুমে করতে হয়বর্ষা মৌসুমে এই কাজের বরাদ্দ পাওয়া যায় নাআমি পানিসম্পদমন্ত্রীকে দশমিনা, চরবোরহান ও গলাচিপা উপজেলার কয়েকটি ভাঙনকবলিত এালাকার কথা বলেছিতিনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন

বিজ্ঞাপন
Advertisement